মধু দিয়ে রূপচর্চা। ত্বক ও চুলের যত্নে মধু

বহু শতাব্দী ধরে বিশ্বের অনেক দেশে ত্বক ও চুলের সৌন্দর্য বৃদ্ধিতে মধু দিয়ে রূপচর্চা হয়ে আসছে। আমাদের দেশেও এর ব্যাপক ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। বর্তমান সময়ে নারী- পুরুষের ত্বক ও চুলের সৌন্দর্য চর্চা অনেক বেশি করেন। নিজেকে সুন্দর করে প্রিয়জনের সামনে উপস্থাপন করার জন্য আমরা কত কিছুই করি।

পার্লারে ,বাসায়, বাজার থেকে কোনো ভালো পণ্যটি কিনলে ত্বক একটু বেশি উজ্জ্বল হবে, ফর্সা হবে। চুলটা কিভাবে ঝলমলে ,উজ্জ্বল ,ঘন ও লম্বা হবে। আরো কত চিন্তা। আশা করি একটি উপাদান ঐ  অতি অল্প সময়ে আপনার সকল সমস্যার সমাধান দিতে পারবে। সেটি আগেই বলেছি আবারো বলছি সেটি হচ্ছে মধু।

মধু হলো এক প্রকারের চটচটে ঘন এবং মিষ্টি স্বাদ যুক্ত তরল পদার্থ। মৌমাছিরা ফুলের নির্যাস থেকে সংগ্রহ করে মৌচাকে সংরক্ষণ করে।

মধুর গুণের কথা বলে শেষ করা সম্ভব না। মধু ৯৯ প্রকার রোগের প্রতিষেধক। আজ আমরা কথা বলবো ত্বক ও চুলের যত্নে মধুর ব্যবহার নিয়ে। চলুন জেনে নেয়া যাক ত্বক ও চুলের যত্নে এবং সৌন্দর্য বৃদ্ধিতে মধুর ব্যবহার নিয়ে।

মধু দিয়ে রূপচর্চা

মধু দিয়ে রূপচর্চা
মধু দিয়ে রূপচর্চা

চুল এবং ত্বকের যত্নে মধু ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। বর্তমানে বাজারে মধু মিশ্রিত অনেক কসমেটিক, ফেসওয়াশ, সাবান পাওয়া যায়। রূপচর্চার পণ্যগুলোতে মধুর ব্যাপক ব্যবহার প্রচলন রয়েছে। মধু দিয়ে কিভাবে রূপচর্চা করা যায়, চুল, এবং ত্বকের যত্ন নেওয়া যায় চলুন সে সম্পর্কে জেনে নেয়া যাক-

ত্বকের যত্নে মধু

সুন্দর ,উজ্জ্বল ও দাগ মুক্ত ত্বক পেতে আমরা সবাই চাই। মধু এমন একটি উপাদান যা ত্বকের প্রায় সকল সমস্যার সমাধান দিয়ে থাকে। সব ঋতুতেই ত্বকের যত্নে মধু ব্যবহার করতে পারি।

ত্বকে বিভিন্ন ধরনের সমস্যা হয়ে থাকে, কারো ব্রণের সমস্যা, কারো কালো দাগ, রোদে পোড়া ত্বক। সব ধরনের ত্বকে আমরা মধু ব্যবহার করতে পারি তা সে ত্বক শুষ্ক, তৈলাক্ত বা নরমাল হোক না কেন।

চলুন শুরু করা যাক ত্বকের যত্নে মধুর ব্যাবহার নিয়ে— 

  • শুষ্ক ত্বকে মধুঃ

শুষ্ক ত্বক শীতে আরও শুষ্ক ও রুক্ষ হয়ে পড়ে ।কারও ত্বক ফেটে গিয়ে বিব্রতকর অবস্থার সৃষ্টি হয়।যদিও জাকিয়ে শীত পড়েছে তাতে কি। এখন থেকে শুরু করে দিন মধুর ব্যবহার। মধুতে রয়েছে আদ্রতা ধরে রাখার ক্ষমতা তাই মধু শুষ্ক ত্বকে ব্যবহার করলে ত্বক নরম ও কোমল হয়।

  • উজ্জলতা বাড়াতেঃ

মধু ত্বকে বিভিন্ন ভাবে উজ্জ্বল করতে সাহায্য করে। এর এন্টি ব্যাকটেরিয়াল বৈশিষ্ট ত্বককে নরম করে এবং জীবাণু ধ্বংস করে। ত্বকে ময়েশ্চারাইজার করে।

  • কালো দাগ দূর করতেঃ

মধু একটি প্রাকৃতিক ময়েশ্চারাইজার। এটি কালো দাগ দূর করতে সাহায্য করে ।নিয়মিত মধু ব্যবহার করলে মুখের ব্রণের দাগ ,কালো দাগ দূর হয়।

  • বলিরেখা বা বয়সের ছাপ আটকায়ঃ

মধু ত্বককে মসৃণ, টানটান এবং হাইড্রেট করে তুলে। এর ফলে বলি রেখা এবং ত্বকে বয়সের ছাপ হ্রাস  করে, ত্বককে মসৃণ করে।

  • লোম কুপের ময়লা পরিষ্কার করেঃ

মধুতে রয়েছে এন্টি -ব্যাকটেরিয়ার বৈশিষ্ট্য যা ত্বককে গভীরভাবে পরিষ্কার করে। লোম কুপের ছিদ্র  বড় থাকলে মধু ব্যবহারের তার সমাধান হয় ।মধু ত্বককে গভীরভাবে পরিষ্কার করে তাই মধুকে প্রাকৃতিক ক্লিনজার হিসেবে নিয়মিত ব্যবহার করতে পারেন ত্বক পরিষ্কার করার জন্য।

  • ব্রণ দূর করতেঃ

ব্রণের সমস্যা অনেকের মধ্যেই দেখা যায় ।ত্বক তৈলাক্ত হলে ব্রণের সমস্যা আরও বেশি থাকে  ।আপনার ব্রণের সমস্যার সমাধান মধুতেই পাওয়া যাবে  ।মধুতে রয়েছে এন্টি ব্যাকটেরিয়াল উপাদান যা ত্বকের ব্রণ দূর করতে সাহায্য করে ।নিয়মিত ব্যবহারে ত্বকে ব্রণ দূর করে  এবং ব্রণ হওয়া  প্রতিরোধ করে।

  • রোদে পোড়া ভাব কমাতেঃ

আমাদের ত্বকের রোদে পোড়া ভাব কমাতে মধু কার্যকরী ।নিয়মিত মধু ব্যবহারের ত্বকের রোদে পোড়া ভাব দূর হয়  এবং ত্বক হয়ে উঠবে উজ্জ্বল ও সুন্দর।

  • ঠোঁটের যত্নেঃ

ঠোঁটকে নরম ও উজ্জ্বল করতে মধু ব্যবহার করুন। মধু ঠোঁটে ব্যবহার করলে ঠোঁট মসৃণ ও কোমল হয়। ফাঁটা ঠোঁটের জন্য ভালো কাজ করে মধু। অনেকের ঠোঁট রুক্ষ থাকে শীতে ঠোঁট আরো বেশি রুক্ষ হয়ে পড়ে। মধু ব্যবহার করলে ঠোট হাইড্রেট থাকে এবং ঠোঁটের মসৃণতা আসে।

চুলের যত্নে মধু

বর্তমান সময়ে আমরা কৃত্রিম জিনিস ব্যবহার করতে বেশি পছন্দ করি। চুলে বিভিন্ন ধরনের স্টাইল করতে পছন্দ করি। আর এগুলো করতে যেয়ে আমরা চুলের বিভিন্নভাবে ক্ষতি করে থাকি। আর প্রাকৃতিক দূষন তো আছেই।

বাইরে বেরোলেই ধুলাবালি-ময়লা, গাড়ির কালো ধোঁয়া, আর শীতকালে চুলের রুক্ষভাব আরো বেড়ে যায়। চুলের স্টাইল করার জন্য আমরা বিভিন্ন ধরনের যন্ত্র ব্যবহার করে থাকি স্টাইলিং এর যন্ত্র ,কার্লিং যন্ত্র। 

আর বর্তমান সময়ে আমরা এতটাই ব্যস্ত যে চুল শুকানোর প্রাকৃতিক পদ্ধতি গুলো ব্যবহার করতে সময় পাইনা। তাই তাড়াতাড়ি চুল শুকানোর জন্য আমরা বেছে নেই হেয়ার ড্রায়ার।

চলুন জেনে নেয়া যাক মধু দিয়া আমরা কীভাবে চুলের যত্ন করে চুলের সৌন্দর্য বাড়াতে পারি  এবং চুলের বিভিন্ন সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে পারি– 

  • ন্যাচারাল কন্ডিশনার হিসেবে

আমরা চুল শ্যাম্পু করার পর  কন্ডিশনার সবাই মোটামুটি ব্যবহার করি। কিন্তু বাজার থেকে কেনা কন্ডিশনার গুলোই আমরা ব্যবহার করে থাকি। মধু কিন্তু দারুণ চুলের কন্ডিশনারের কাজ করে। তাই  চুলে ন্যাচারাল কন্ডিশনার হিসেবে মধু ব্যবহার করতে পারেন।

  •  চুল রং করতে

আমরা সবাই চুল রং করতে বর্তমান সময়ে খুবই পছন্দ করি। চুলের হাইলাইট করতে মধুর ব্যবহার আপনি প্রাকৃতিক ভাবে করতে পারেন।

  • অতিরিক্ত চুল পড়ার কারণ এবং সমাধান

মধুতে রয়েছে এন্টি-অক্সিডেন্ট এবং এন্টি-ব্যাকটেরিয়াল উপাদান যা ক্ষত নিরাময়ে বহুযুগ ধরে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। এটি চুলের গ্রন্থি কোষগুলোকে খুব শক্তিশালী করে ।ফলে চুল ঘন ও লম্বা হয়। মাথার ত্বকে সমস্যায় ,খুশকি প্রতিরোধে মধু কার্যকরী ভূমিকা পালন করে। শীতকালে খুশকির সমস্যা কমবেশি সবারই দেখা যায়। তাই খুশকি থেকে বাঁচতে নিয়মিত মধু ব্যবহার করতে পারেন।

  • চুলের জেল্লা বেড়াতে

মধু চুলকে উজ্জ্বল ঝলমলে করে তুলে। তাই সুন্দর ঝলমলে চুল পেতে মধু ব্যবহার করুন ।মধু চুলে ময়েশ্চারাইজার হিসেবে কাজ করে।

আমরা অনেকেই সুন্দর এবং ঝলমলে উজ্জ্বল ত্বক ও চুল চাই। কিন্তু সময়ের অভাবে কিংবা অলসতা করে সৌন্দর্য  চর্চা করতে চাই না। তাদের জন্য থাকলো কিছু সহজ প্যাক।  

ত্বকের যত্নে প্যাক

পানি দিয়ে মুখ ভালো ভাবে ধুয়ে সেই ভিজা মুখে সামান্য পরিমাণ মধু নিয়ে ভালো করে মাসাজ করুন ২ থেকে ৩ মিনিট  তারপর নরমাল পানি দিয়ে মুখ ধুয়ে ফেলুন। এতে মুখ পরিষ্কার হবে ত্বকের সৌন্দর্য ও উজ্জ্বলতা বাড়বে এবং   ত্বক নরম ও টানটান হবে ।খানিকটা ঠোঁটেও লাগিয়ে নিন।

চুলের যত্নে প্যাক

চুলের যত্নে আপনি শ্যাম্পু করার সময় শ্যাম্পুর সাথে পরিমাণমতো মধু মিশিয়ে নিন তারপর চুলে ব্যবহার করুন। ভালো করে চুলে ও মাথায় মাসাজ করে ভালো করে চুল ধুয়ে ফেলুন  তারপর দেখুন ম্যাজি।

ত্বক ও চুলের যন্ত্রে আরো অনেক ব্যবহার রয়েছে মধুর। অনেক ভাবে ব্যবহার করা যায় কিন্তু আমি সবচেয়ে সহজ পদ্ধতি গুলো আপনাদের দেখিয়ে দিলাম। যারা সময়ের অভাবে কিংবা অলসতা করে ত্বক চর্চা করছেন না, চুলের যত্ন করেন না তাদের জন্য খুবই কার্যকরী পদ্ধতি। আমি নিজেই পদ্ধতি গুলো ব্যবহার করি। এই দুটি পদ্ধতি খুবই কার্যকরী।

তবে ব্যাবহার করার পূর্বে  নিশ্চিত হয়ে নিন মধু ব্যাবহারে আপনার ত্বকে কোন সমস্যা হচ্ছে কিনা ।নিশ্চিত হয়ে তার পর ব্যাবহার করুন।

মধুর আরো কিছু ব্যবহার 

  • ১.

উপকরণঃ মধু, বেসন /চালের গুঁড়ো /ময়দা ।

পদ্ধতিঃ  মধুর সাথে বেসন বা চালের গুঁড়া বা ময়দা পরিমাণমতো নিয়ে একসাথে মিক্স করে নরমাল ফেসওয়াশ এর মত ব্যবহার করুন। তারপর নরমাল পানি দিয়ে ওয়াশ করে নিন  এতে ত্বকের ময়লা দূর হবে এবং পরিষ্কার হবে । এটি ফেসওয়াশ এর মত কাজ করবে।

  • ২.

উপকরণঃ মধু ,কটনবাট ,স্যানডালউড পাউডার।

পদ্ধতিঃ মধু  এবং স্যানডালউড পাউডার একসাথে মিক্স করে কটনবাট দিয়ে আপনার ব্রণের উপর লাগিয়ে পুরো রাত রেখে দিন। সকালে নরমাল পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলুন। এতে আপনার ব্রণের সমস্যা কমবে এবং ব্রণের দাগ দূর হবে।

  • ৩.

 উপকরণঃ মধু এবং পানি ।

পদ্ধতিঃমধু  এবং পানি সমপরিমানে মিক্স করে ঠোঁটে লাগিয়ে রাখুন ৫মিনিট পর ধুয়ে ফেলুন। এতে ঠোঁট নরম ও উজ্জ্বল হবে ।শীতে ঠোঁট ফাটায় নিশ্চিন্তে লাগাতে পারেন।

  • ৪.

উপকরণঃ  ৩ টেবিল চামচ মধু এবং ২ টেবিল চামচ অলিভ অয়েল বা নারিকেল তেল ।

পদ্ধতিঃ মধু এবং তেল একসাথে ভালো ভাবে মিক্সট করে  চুলে দিয়ে ৩০ মিনিট অপেক্ষা করুন তারপর চুল ভালো করে শ্যাম্পু করে ধুয়ে নিন ।মনে রাখবেন এটি আপনার চুলের ত্বকে ব্যবহার করবেন না ।শুধু চুলের আগায় ব্যবহার করবেন  এতে চুলের জেল্লা বাড়বে ।

  • ৫.

উপকরণঃ ২ টেবিল চামচ মধু এবং ১চা চামচ লেবুর রস ।

পদ্ধতিঃ   মধু এবং লেবুর রস ভালোভাবে একসাথে মিক্সড করে আপনার যেখানে পিগমেন্টেশন এরিয়া আছে সেখানে ভাল করে লাগিয়ে ১৫ থেকে ২০ মিনিট রেখে দিয়ে নরমাল পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলুন ।

  • ৬.

উপকরণঃ মধু এবং এলোভেরা জেল ।

পদ্ধতিঃ মধু এবং এলোভেরা জেল পরিমাণমতো নিয়ে ভালো করে মিক্স করে আপনার যেখানে রোদে পোড়া ভাব ত্বক আছে সেখানে ভালো করে ম্যাসাজ করুন । তারপর ভালো করে নরমাল পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলুন  ।এতে আপনার ত্বকের রোদে পোড়া ভাব দূর হবে ।

  • ৭.

উপকরণঃ  তিন থেকে চার চামচ টক দই ,মধু এবং অলিভ অয়েল ।

পদ্ধতিঃ মধু ,অলিভ অয়েল এবং টক দই ভালো করে মিক্সড করে আপনার চুলে  লাগিয়ে ৩০ মিনিট রেখে তারপর শ্যাম্পু করে ধুয়ে ফেলুন । এটি আপনার চুলের কন্ডিশনিং এর কাজ করবে ।

আশাকরি লেখাটি পড়ে সবাই উপকৃত হবেন। ছেলে বা মেয়ে সবাই প্যাক গুলো ব্যবহার করতে পারবেন।

সতর্কতাঃ 

কিছু সতর্কতা আপনাকে মেনে চলতেই হবে।

  • যেকোনো প্যাক ব্যবহারের পূর্বে আপনি প্যাচ  টেস্ট করতে ভুলবেন না।

প্রথমে সামান্য পরিমাণ নিয়ে আপনার ত্বকে ব্যবহার করে দেখুন যদি কোন এলার্জি রিএকশন বা কোন প্রবলেম না হয় তবেই পুরো তোরে ব্যবহার করা শুরু করুন।

যদি দেখেন কোন সমস্যা হচ্ছে তবে ব্যবহার বন্ধ করে দেওয়াই ভালো। ত্বক বা চুলের সমস্যা বেশি হলে চিকিৎসকের শরনাপন্ন হোন।

সবাই ভালো থাকুন। সুস্থ থাকুন।

আল্লাহ হাফেজ 

Leave a Comment