শ্বাসকষ্ট হলে করণীয় ব্যায়াম। হাঁপানি, বক্ষব্যাধি থেকে মুক্তি পান সহজেই

জেনে নিনঃ শ্বাসকষ্ট হলে করণীয় ব্যায়াম,  কি ঔষধ খেতে হবে, মুক্তির উপায়, গর্ভাবস্থায় শ্বাসকষ্ট হলে করণীয়। আজকের এই আর্টিকেলটিতে আমি এ সকল প্রশ্নের উত্তর জানার চেষ্টা করব। 

ছোট শিশু থেকে বৃদ্ধ যেকোনো বয়সেই শ্বাসকষ্টের সমস্যা হতে পারে। হঠাৎ শ্বাসকষ্ট হলে কি করণীয় সে সম্পর্কে জেনে রাখা জরুরি। তাহলে চলুন জেনে নেয়া যাক শ্বাসকষ্ট হলে করণীয় কি-

শ্বাসকষ্ট হলে করণীয় ব্যায়াম

বিভিন্ন কারণে একজন ব্যক্তির শ্বাসকষ্ট হতে পারে। প্রধানত সর্দি, কাশি, নিউমোনিয়া, ব্রঙ্কাইটিস, হৃদরোগ, পেটের সমস্যা, গ্যাস, হজমের সমস্যা, অ্যালার্জি, অ্যাজমা, র*ক্তস্বল্পতা, অতিরিক্ত মানসিক চাপ এবং টেনশন কারণে শ্বাসকষ্টের সমস্যা হতে পারে।

এ কারণে বিশেষজ্ঞরা শ্বাসকষ্ট রোগীদের সুস্থ হতে চিকিৎসার পাশাপাশি ফুসফুসের ব্যায়ামের ওপর জোর দিচ্ছেন। কারণ শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম ফুসফুসকে সুস্থ রাখে। এছাড়াও, শরীরে অক্সিজেন সঞ্চালন বাড়াতে কিছু শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম নিয়মিত করা উচিত। জেনে নিন শ্বাসকষ্ট হলে করণীয় ব্যায়াম কী কী-

শ্বাস গোনার ব্যায়াম: ফুসফুস সুস্থ রাখার জন্য এটি অন্যতম সেরা ব্যায়াম। মেরুদণ্ড ও ঘাড় সোজা করে বসুন। মেরুদণ্ড  টানটান  করে দীর্ঘ শ্বাস নিন। প্রথমে শ্বাস ছাড়ার সময় ১ গণনা করুন, তারপরে ২, এভাবে ৫ পর্যন্ত। তারপর নতুন করে শুরু করুন। প্রতিদিন ১০ মিনিটের জন্য এই ব্যায়াম করুন।

অনুলোম বিলোম: এই ব্যায়ামটি ফুসফুস থেকে দূষিত বাতাস বের করে দেওয়ার জন্য এবং শরীরে অক্সিজেনের সঞ্চালন বাড়ানোর জন্য আদর্শ। নিয়মিত ব্যায়াম ফুসফুসকে শক্তিশালী করে এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। মেরুদণ্ড  সোজা করে বসুন এবং আপনার চোখ বন্ধ করুন। ডান হাতের বুড়ো আঙুল দিয়ে ডান নাসারন্ধ্রে চেপে ধরুন। বাম নাকের ছিদ্র দিয়ে শ্বাস নিন। কিছুক্ষণ ধরে রাখুন। একইভাবে, আপনার আঙুল দিয়ে বাম নাকের ছিদ্র বন্ধ করুন এবং ডান নাসারন্ধ্র দিয়ে শ্বাস ছাড়ুন। আবার উল্টোটা করুন। এই পুরো পদ্ধতিটি কমপক্ষে ৫ বার করুন।

হাই তোলা থেকে হাসি: এই ব্যায়াম করলে বুকের পেশী শক্ত হয় এবং শরীরে অক্সিজেনের পরিবহণ বাড়ে। ফুসফুসের স্বাস্থ্যও ভালো থাকে। মেরুদণ্ড  সোজা করে বসুন এবং আপনার পিঠ টানটান রাখুন। যেন হাই তুলছেন এমন মুখভঙ্গি তৈরি করুন যাতে আপনার কাঁধ উচু হয়ে ওঠে। ধীরে ধীরে মুখ বন্ধ করুন এবং হাসির মতো মুখভঙ্গি করুন।

মুখ দিয়ে শ্বাস ছাড়া: শরীরে অক্সিজেনের মাত্রা বাড়াতে এই ব্যায়াম খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আপনার পিঠ সোজা করে আরাম করে বসুন। ‘হিস’ শব্দ করে আপনার ফুসফুস থেকে সমস্ত বাতাস ত্যাগ করুন। এই ব্যায়ামটি কমপক্ষে ৫ বার করা উচিত। এটি ফুসফুসের কর্মক্ষমতা বাড়ায় এবং মানসিক চাপ কমায়। 

কোন ব্যায়াম পদ্ধতি শুরু করার আগে আপনার ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করা গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষ করে যদি আপনার অ্যাজমা বা অন্যান্য শ্বাসকষ্টের লক্ষণ থাকে।

শ্বাসকষ্ট হলে করণীয়

শ্বাসকষ্ট দুই ধরনের হতে পারে: স্বল্পমেয়াদী এবং দীর্ঘমেয়াদী। স্বল্পমেয়াদী এবং হালকা শ্বাসকষ্ট ঘরোয়া উপায়ে প্রতিকার করা যেতে পারে। কিন্তু যখন শ্বাসকষ্ট গুরুতর স্বাস্থ্য সমস্যা অর্থাৎ শ্বাসকষ্ট তীব্র হয় তখন একজন ডাক্তার দেখাতে হবে।

কিছু ঘরোয়া পদ্ধতি অবলম্বন করে শ্বাসকষ্ট থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। তাহলে আসুন জেনে নেই শ্বাসকষ্ট হলে করণীয় কি।

  1. ব্রিদিং এক্সারসাইজ করা
  2.  স্টিম ইনহেলেশন নেওয়া
  3.  নিয়মিত আদা চা পান 
  4. দুধের সাথে হলুদ মিশিয়ে পান করা।

যদি শ্বাসকষ্ট তীব্র হয়, ঘরোয়া উপায়ে ভালো ফল না দেয়, বা শ্বাসকষ্ট ছাড়াও অন্যান্য উপসর্গ যেমন মাথাব্যথা, বুকে বা পিঠে ব্যথা, জ্বর, বমি বমি ভাব বা বমি হলে অবিলম্বে নিকটস্থ হাসপাতাল বা ডাক্তারের সাথে যোগাযোগ করুন।

শ্বাসকষ্ট হলে কি ঔষধ খেতে হবে

রেজিস্টার্ড ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া কখনই ওষুধ কিনে খাওয়া উচিত নয়। যদি আপনার শ্বাসকষ্ট থাকে তাহলে অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ মতো প্রেসক্রাইব করা ওষুধ কিনে খাবেন। 

ট্যাবলেট:

  • মোনাস
  • ফেনাডিন
  • ডক্সিভা
  •  থিওফাইলিন 
  • মন্টিলুকাস্ট 
  • কেটোটিফেন
  • স্টেরয়েড 

 ইনহেলার:

  • Sulmolin 
  • Bexitrol F
  • Beta adrenergic agonist 
  • Corticosteroid

ইনহেলার ব্যবহার করার পরে কুলি করতে ভুলবেন না। 

শ্বাসকষ্ট হলে কি খেতে হয়

শ্বাসকষ্ট উপশমে সাহায্য করতে পারে এমন কোনো নির্দিষ্ট খাদ্য নেই, তবে স্বাস্থ্যকর এবং সুষম খাদ্য খাওয়া সামগ্রিক স্বাস্থ্য ভালো রাখতে সাহায্য করে এবং সম্ভাব্য লক্ষণগুলি উপশম করতে সহায়তা করতে পারে।আপনার শ্বাসকষ্ট থাকলে যেসব খাবার বেশি খাওয়া উচিত তা নিচে দেওয়া হল:

  • বিভিন্ন ধরনের ফল এবং শাকসবজি খান: এই খাবারগুলিতে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন এবং খনিজ রয়েছে। ফল এবং শাকসবজি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে এবং আপনার সামগ্রিক স্বাস্থ্যের উন্নতি করতে সাহায্য করবে।
  • প্রক্রিয়াজাত খাবার সীমিত করুন: প্রক্রিয়াজাত খাবারে সোডিয়াম, চিনি এবং অস্বাস্থ্যকর চর্বি বেশি থাকে, যা শরীরে প্রদাহ সৃষ্টি করতে পারে।
  • প্রচুর পানি পান করুন: পর্যাপ্ত পানি পান করা আপনার শরীরকে হাইড্রেটেড রাখতে এবং ফুসফুস সহ অন্যান্য অঙ্গগুলির কার্যকারিতা বাড়াতে সহায়তা করে।
  • আদা চা: শ্বাসনালীর সংকোচন এবং প্রদাহ কমাতে আদা কার্যকর। আদা চা বা আদাকুচি চিবোলে শ্বাসকষ্ট কমে।
  • মধু: হাঁপানি রোগীদের উপসর্গ কমাতেও মধু খুবই কার্যকরী।  ১ চা চামচ মধু ৮ আউন্স কুসুম গরম পানিতে মিশিয়ে দিনে দুই থেকে তিনবার পান করুন। 

যেসব খাবারে শ্বাসকষ্ট উপসর্গগুলো বৃদ্ধি পায় তা এড়িয়ে চলাই ভালো।

পড়তে পারেনঃ পেটের মেদ কমানোর ব্যায়াম ছবি সহ। ভুড়ি কমান ঘরোয়া পদ্ধতিতে

শ্বাসকষ্ট থেকে মুক্তির উপায়

শ্বাসকষ্ট দূর করার বিভিন্ন উপায় রয়েছে, তবে সর্বোত্তম পদ্ধতিটি অন্তর্নিহিত কারণের উপর নির্ভর করে। শ্বাসকষ্ট দূর করার কিছু সাধারণ উপায় হল:

  • অন্তর্নিহিত অবস্থার চিকিৎসা: আপনার শ্বাসকষ্টের কারণ যদি একটি নির্দিষ্ট স্বাস্থ্যগত কারনে হয়, তবে সেই অবস্থার চিকিৎসা উপসর্গগুলি কমাতে সাহায্য করবে। উদাহরণস্বরূপ, যদি আপনার হাঁপানি থাকে, একটি রেসকিউ ইনহেলার ব্যবহার করা বা আপনার ডাক্তারের দ্বারা নির্ধারিত অন্যান্য ওষুধ গ্রহণ করলে আপনার শ্বাসনালী পরিষ্কার হতে এবং শ্বাসকষ্ট কমাতে সাহায্য করবে।
  • পার্সড-ঠোঁট শ্বাস এবং ডায়াফ্রাম্যাটিক শ্বাস: এই ব্যায়ামগুলি আপনার শ্বাস-প্রশ্বাসকে ধীর করতে এবং আরও নিয়ন্ত্রিত করতে সাহায্য করবে, যা শ্বাসকষ্ট দূর করতে পারে।
  • অক্সিজেন থেরাপি: আপনার শরীরে অক্সিজেনের অভাবের কারণে যদি শ্বাসকষ্ট হয়, তবে অক্সিজেন থেরাপি আপনার র*ক্তে অক্সিজেনের ঘাটতি পূরণ করতে এবং আপনার উপসর্গগুলি উপশম করতে সাহায্য করবে।
  • ঔষধ: আপনার ডাক্তার শ্বাসকষ্ট কমাতে সাহায্য করার জন্য ব্রঙ্কোডাইলেটর বা শ্বাসনালি প্রসারক, কর্টিকোস্টেরয়েড, বা ফসফোডাইএস্টারেজ ইনহিবিটর এর মত ঔষধ লিখে দিতে পারেন।
  • লাইফস্টাইল পরিবর্তন: আপনার জীবনধারা পরিবর্তন, শ্বাসকষ্ট উপশম করতে সাহায্য করতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, ধূমপান ত্যাগ করা, যেসব কারণে অ্যাজমা বা অ্যালার্জি বারে সেগুলি এড়িয়ে চলা এবং দূষিত বায়ু থেকে দূরে থাকা। এসব আপনার ফুসফুসের কার্যকারিতা উন্নত করতে এবং শ্বাসকষ্ট কমাতে সাহায্য করবে।

আপনার শ্বাসকষ্টের সঠিক কারণ এবং চিকিৎসা সর্বোত্তম নিশ্চিত করতে ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করা গুরুত্বপূর্ণ।

হঠাৎ শ্বাসকষ্ট কি করনীয়

শ্বাসকষ্ট হলে করণীয় ব্যায়াম। হাঁপানি, বক্ষব্যাধি থেকে মুক্তি পান
শ্বাসকষ্ট হলে করণীয় ব্যায়াম। হাঁপানি, বক্ষব্যাধি থেকে মুক্তি পান

অ্যাজমা রোগীদের হঠাৎ শ্বাসকষ্ট হওয়া স্বাভাবিক। বিশেষ করে হঠাৎ ঠান্ডা আবহাওয়া, ধুলাবালি, ঘর ঝাড়ু দেওয়া বা ফুলের রেণুর সংস্পর্শে রোগীর এ সমস্যা বেশি হয়। ভাইরাল ইনফেকশন, সর্দি-কাশিও এই সমস্যার জন্য দায়ী। হঠাৎ শ্বাসকষ্ট কি করনীয়! বিশেষ করে, একটি ছোট শিশু হলে কী করতে হবে তা জানা গুরুত্বপূর্ণ:

রোগীকে সোজা হয়ে বসতে বলুন এবং তাকে আশ্বস্ত করুন যে কিছুই ঘটেনি, আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই।

 রিলিভার ইনহেলার স্পেসারের সাহায্যে ধীরে ধীরে শ্বাস নিতে হবে। বয়স্ক এবং শিশুদের ক্ষেত্রে, ওষুধটি সঠিকভাবে শ্বাস নেওয়া হয়েছে কিনা তা লক্ষ্য করুন, গিলে ফেললে এটি কাজ করবে না।

 তারপরেও শ্বাসকষ্ট বা হাঁপানির উত্তেজনা না কমলে রোগীকে নিকটস্থ হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে বা নেবুলাইজার যন্ত্রের সাহায্য নিতে হবে।

শুরুতে জিহ্বা, নখ বা আঙুল নীল হয়ে গেলে, শ্বাসকষ্টের কারণে কথাও বলতে না পারলে বা জ্ঞান হারিয়ে ফেললে দ্রুত হাসপাতালে যাওয়াই ভালো। এক্ষেত্রে নেবুলাইজার ছাড়াও অক্সিজেনের প্রয়োজন হতে পারে।

গর্ভাবস্থায় শ্বাসকষ্ট হলে করণীয়

গর্ভবতী মহিলাদের যাদের হাঁপানি আছে বা গর্ভাবস্থায় হাঁপানি ধরা পড়েছে তাদের শুরু থেকেই একজন বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞের নিয়মিত তত্বাবধানে থাকা উচিত। প্রতিটি মায়ের তার শ্বাসকষ্টের তীব্রতার উপর নির্ভর করে একটি পৃথক  চিকিৎসা পরিকল্পনা থাকে।

শ্বাসকষ্ট আক্রান্ত মায়েদের একটি বিষয়ে আশ্বস্ত করা দরকার যে এই রোগে ব্যবহৃত ওষুধগুলি অনাগত শিশুর জন্য নিরাপদ। দেখা যায়, অনেকেই গর্ভস্থ সন্তানের ক্ষতির কথা ভেবে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই হঠাৎ করে ঔষধ খাওয়া বন্ধ করে দেন, ফলে শ্বাসকষ্ট বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে এবং অনেক সময় নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে।

যদি কোন বিপজ্জনক উপসর্গ না থাকে, গর্ভাবস্থায় শ্বাসকষ্টে মা এবং শিশুর জন্য চিন্তার কিছু নেই । তবে নিশ্চিন্ত থাকার জন্য চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই ভালো।

পরিশেষে,

আশা করি, শ্বাসকষ্ট হলে করণীয় ব্যায়াম, কি ঔষধ খেতে হবে, মুক্তির উপায়, হঠাৎ গর্ভাবস্থায় শ্বাসকষ্ট হলে করণীয়, সম্পর্কে জানতে পেরেছেন। যদি আপনার কোন কিছু জানার থাকে তাহলে অবশ্যই প্রশ্ন করবেন উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করব। যে কোন ঔষধ সেবনের পূর্বে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

Leave a Comment